আচরণগত সমস্যা, জীবনযাত্রা, সামাজিক সচেতনতা, সাম্প্রতিক

যৌন হয়রানি ; শিশুরাই কি প্রধান শিকার?

আপনার উচ্ছল সন্তান হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে গেল কেন? সব বাচ্চারা যেখানে খেলায় মত্ত, আপনার শিশু ঘরের এক কোণায় লুকিয়ে থাকে কেন? রোজ সন্ধ্যায় আপনার বাসায় বেড়াতে আসা বন্ধুটিকে ভয় পায় কেন সে?

“ও এমনই” বলে আর এড়িয়ে যাবেন না। আপনার এই অবহেলার সুযোগ নিয়ে আপনার পাশেই চলছে নিশ্চুপ যৌন হয়রানি ; যার শিকার হচ্ছে আপনার সন্তান। এই নির্যাতন বন্ধ করতে “পাছে লোকে কিছু বলে” না ভেবে বাবা মা দুজনকেই সচেতন হতে হবে।

শিশুদের যৌন হয়রানি কী?

শিশু নির্যাতনের একটি অন্যতম অংশ শিশুদের যৌন হয়রানি । অবুঝ শিশুদের অপব্যবহার করে নিজের যৌন উদ্দীপনা পরিতৃপ্ত করার নামই শিশু যৌন হয়রানি । বেশিরভাগ শিশুরাই বুঝতে পারে না যে তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে; কিন্তু এই ধরনের হয়রানির পর তারা খুব ভীত হয়ে পরে এবং মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়ে।

যেকোন স্থানে আপনার সন্তান যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে। স্কুলে, রাস্তায়, কাজে (শিশু শ্রমিকের ক্ষেত্রে), গাড়িতে এমনকি বাড়িতেও শিশু যৌন হয়রানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাধারণত কাছের মানুষের কাছেই বা যারা বেশি সময় কাছে থাকে তাদের হাতেই শিশুদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যায়।

শিশুদের যৌন হয়রানি সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

  • শুধুমাত্র আঘাত করলেই শিশু নির্যাতন হয় অন্যথায় হয় না।
  • শুধুমাত্র খারাপ লোকেরা শিশুদের যৌন হয়রানি করে থাকে।
  • ভাল পরিবারে শিশু যৌন হয়রানি বা শিশু নির্যাতন হয় না।
  • যারা শিশুদের নির্যাতন বা যৌন হয়রানি করে তারা অপরিচিত।
  • যারা ছোট বেলায় নির্যাতনের শিকার হয়, বড় হলে তারাই শিশু নির্যাতন করে।

কারা এ ধরনের যৌন হয়রানি করে থাকে?

  • যে কোন মানুষের দ্বারা শিশু যৌন হয়রানি হওয়া সম্ভব, এমনকি নিজের বাবা-মার কাছেও শিশুরা যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে।
  • যারা বাচ্চাদের দিয়ে নিজের যৌন আকর্ষণের পরিতৃপ্তি ঘটায় তাদেরকে পেডোফাইল(pedophile) বলে।
  • যে সকল মানুষ বাচ্চার কাছে বেশি সময় একা থাকে এবং তার যদি পেডোফিলিয়া সমস্যা থাকে তাহলে বাচ্চাটি যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে। সাধারণত বড় ভাই-বোন, বাসার কাজের লোক, দুঃসম্পর্কের আত্মীয়, শিক্ষক, বাবা বা মায়ের বন্ধু ইত্যাদি লোকের দ্বারা কোন শিশু যৌন হয়রানির শিকার হতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন আপনার শিশুটি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে?

  • স্বভাবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে। যেমন- মেজাজ খিটখিটে থাকবে, ভয় ও দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পাবে, বাসায় যেতে চাবে না, কোন একজনের থেকে দূরে দূরে থাকবে এবং দেখে ভয় পাবে ইত্যাদি।
  • বয়সের তুলনায় অত্যাধিক যৌন আবেদন বা খারাপ ভাষার প্রয়োগ করতে পারে।
  • ঘুমের অভ্যাস এবং দেহভঙ্গিতে পরিবর্তন আসবে। অতিরিক্ত দুঃস্বপ্ন দেখবে এবং ঘুমাতে সমস্যা হবে।
  • স্কুলে উপস্থিতি এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাবে। ক্লাসে মনোযোগ দিতে সমস্যা হবে, রেজাল্ট খারাপ হতে থাকবে।
  • খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আসবে। হয় অত্যাধিক ওজন বাড়বে না হয় একেবারে কমে যাবে।
  • শরীরে ক্ষত দেখতে পাবেন কিন্তু কোন কারণ সে বলতে পারবে না। যেমন- পোড়া দাগ, কাটা ছেড়ার দাগ, ফুলে যাওয়া, হাড়ে ব্যথা ইত্যাদি।
  • হাঁটতে-চলতে বা বসতে সমস্যা হবে।

যৌন হয়রানি; তার প্রভাব

  • যৌন হয়রানির শিকার কোন শিশু ভবিষ্যতে কারো উপর বিশ্বাস করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
  • সম্পর্কে আস্থা থাকে না।
  • বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগে।
  • নিজেকে মূল্যহীন এবং ছোট মনে করতে থাকে।
  • আবেগ অনুভূতি হারিয়ে ফেলে।

সতর্কতা

শিশুদের যৌন হয়রানি বন্ধ করতে আপনার আমার সচেতনতা জরুরী। এছাড়াও-

  • যতক্ষণ সম্ভব বাচ্চার সাথে থাকুন। দিন শেষে সে সারা দিনে কী কী করল তা জানতে চেষ্টা করুন।
  • বাচ্চার সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করুন। আপনার আর সন্তানের মধ্যে যেন দূরত্ব তৈরি না হয়।
  • চাকরি বা অন্য কোন কারণে কোথাও যেতে হলেও কিছুক্ষণ পর পর বাচ্চার খোঁজ নিন।
  • নিজে শিশু নির্যাতন এবং যৌন হয়রানি সম্বন্ধে জানুন এবং আপনার এ সম্পর্কে অবগত করুন।
  • আপনার সন্তানের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি তা বোঝার চেষ্টা করুন। আবেগের বশবর্তী না হয়ে যৌক্তিকতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
  • কথা বলুন। ভাল-খারাপ সম্বন্ধে যথাযথ শিক্ষা দিন।
  • বাসার কাজের লোক, স্কুলের বা প্রাইভেট শিক্ষক, দুঃসম্পর্কের আত্মীয় ইত্যাদি লোকের সাথে যেন বেশিক্ষণ একা না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
  • আপনার ড্রাইভারের কাছে নিশ্চিন্তে বাচ্চাকে দিয়ে রাখবেন না। ওদের দিকে নজর রাখুন।
  • আপনার কাছের বন্ধু কেন একান্তে আপনার শিশুর সাথে সময় কাটাতে চায় সে বিষয়ে খোঁজ নিন।

সমাধান 

যদি আপনার সন্দেহ হয় বা আপনার সন্তান যদি আপনাকে ইঙ্গিত দেয় যে সে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিন। মনে রাখবেন, লোক লজ্জার ভয়ে চেপে রাখলে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যাবে; যার শিকার হবে আপনার সন্তান ও আপনার পুরো পরিবার। প্রয়োজন হলে শিশুকে যথাযথ কাউন্সিলিং করান; মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Comments

comments

Previous Post Next Post

You Might Also Like

Comments are closed.