শিশুর প্রাথমিক শিক্ষায়তন পরিবার মানেন কি?
অন্যান্য, গবেষণা, নবজাতক এবং শিশুর যত্ন, বিষেশজ্ঞ মতামত, সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্য সংবাদ

শিশুর প্রাথমিক শিক্ষায়তন পরিবার মানেন কি?

আমরা শিশুদের প্রতি কতটা যত্নশীল? এইটা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? অথচ আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ আবশ্যক। ঘর থেকেই শিশুর সার্বিক বিকাশ ঘটে। শিশুর আচরণের ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিষয়সমূহ অনেকক্ষেত্রেই তার নিজ পরিবারের সদস্যদের উপর নির্ভর করে। শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশে আপনার বন্ধুসুলভ আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায়তনে পরিবার কতটা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে আসুন আমরা এই বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নেই।

শিশুর আদবআচরণের প্রতি খেয়াল রাখুনঃ শিশুকে বড়দেরকে শ্রদ্ধা এবং ছোটদেরকে ভালোবাসার শিক্ষা দিতে হবে। যেমনঃ আপনি নিজে যদি বড়দের প্রতি বাধ্য ও শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করেন এবং শিশুদেরকে ভালোবাসেন তাহলে আপনার শিশুটিও এধরনের আচরণ শিখবে।

শিশুকে সহনশীল হতে পরিবারের ভূমিকাঃ পরিবার থেকেই শিশু সহনশীলতার শিক্ষা পেয়ে থাকে। মা-বাবা যদি শিশুর সাথে সহনশীল আচরণ করেন তাহলে শিশুও সহনশীল হতে শিখবে। বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে সঙ্গে গৃহকর্মীদেরও যাতে তারা শ্রদ্ধা-সহনশীলতার সাথে গ্রহন করে তা শিখাতে হবে।

ভদ্রবিনয়ী হতে শেখানোঃ ভদ্র ও বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা শিশু পরিবার থেকে পেয়ে থাকে। পরিবারের ছোট-বড় সবার মাঝে পারস্পারিক সালাম বিনিময়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বড়দেরকে জানিয়ে বাড়ির বাইরে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবার টেবিলে বয়োজ্যেষ্ঠদের খাবার তুলে দেওয়া এবং সবার খোঁজখোবর নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।

শিশুকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখানোঃ পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম পাঠশালা। শিশু যখন নিজ থেকে কোন কিছু করতে যায় তখন অনেকেই শিশুকে পড়ে যাওয়া বা ব্যথা পাওয়ার ভয়ে তাকে তা করতে না দিয়ে নিজেরাই করে দেন। এধরনের ক্ষেত্রে প্রায় শিশুরাই আত্ননির্ভরশীল ও আত্নবিশ্বাসী হয়ে উঠেনা। এক্ষেত্রে সকলেরই উচিত শিশুকে নিজ থেকে কাজ করতে দেয়া আর পাশে থেকে তাকে কিছুটা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া।

শিশুর খাদ্যাভাসে পরিবারের ভুমিকাঃ শিশুর হাঁটতে শেখা থেকে বয়স্ক হওয়ার মধ্যে অন্য সবার মতো সেও খায়, খেলে ও ঘুমায়। এগুলো সে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে শেখে। বাংলাদেশের মতো গরীব দেশে জন্মালে সে শেখে হাত দিয়ে খাওয়া। ধনী কোন দেশে জন্মালে শেখে চামচে খাওয়া। আবার এদেশের কোন অবস্থাপন্ন বা শিক্ষিত পরিবারে জন্মালে সে শেখে খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার নিয়ম। এসমস্ত শিক্ষা শিশু পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে।

পোশাক নির্বাচন করতে পরিবারের গুরুত্বঃ শিশুর পোশাক-পরিচ্ছদ মার্জিত হবে কিনা তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা-বাবার রুচির উপর নির্ভর করে। পরিবারের অভিভাবকদের উচিত ছোটবেলা থেকেই শিশুকে পোশাক নির্বাচনে সচেতন করা। এর ফলে শিশুর ব্যক্তিত্ব ও রুচি উন্নত হবে।

বন্ধুসুলভ আচরণ শেখানোঃ আপনার শিশুটি অন্যান্য শিশুদের সাথে কেমন আচরণ করছে তা অনেকক্ষেত্রেই নির্ভর করবে পরিবারের অভিভাবকদের ইতিবাচক আচরণের উপর। মা-বাবার উচিত শিশুদেরকে বন্ধুসুলভ আচরণ শেখার ক্ষেত্রে সহায়তা করা। এটি শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের উপর গুরত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বিরত রাখাঃ শিশুদেরকে অধিকাংশ সময় মোবাইল, ইন্টারনেট, গেমস ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এর ফলে সে বাইরের পরিবেশের সাথে মেলামেশার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাদের এইরূপ অজ্ঞতার কারণে শিশু বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। শিশুদের কাছে যেন এই সকল আধুনিক প্রযুক্তি সহজলভ্য না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রলোভন দেখানো থেকে বিরত থাকাঃ অনেক সময় আমরা শিশুদেরকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করি। যেমন হয়তো বলি, শিশু পরীক্ষায় প্রথম হলে তাকে দামি উপহার দেওয়া হবে। কিন্তু কোন প্রকার প্রলোভন না দেখিয়ে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল বা আগ্রহের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

ভয়ভীতি না দেখানোঃ অধিকাংশ মাদেরকে দেখা যায় শিশুকে খাওয়ানোর সময় অথবা পড়ানোর সময় ভয় দেখান। কিন্তু এই ধরনের আচরণ মোটেও ঠিক নয়। এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তাই এই বিষয়টির প্রতি সচেতন হতে হবে।

শিশুর মানসিক চাপ প্রতিরোধে পরিবারকে কলহমুক্ত রাখুনঃ পারিবারিক কলহের চাপ শিশুদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। যেসব শিশু মা-বাবার মনোমালিন্য দেখতে দেখতে বড় হয়, তারা হতাশ, অসামাজিক ও সহিংস হয়ে ওঠে। এজন্য পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের উচিত পারিবারিক কলহের প্রভাব থেকে শিশুকে মুক্ত রাখা।        

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়ঃ শিশুরা প্রতিনিয়ত বড়দেরকে অনুকরণ করে থাকে। অধিকাংশ যৌথ পরিবার দাদা-দাদী, চাচ-চাচী এবং আরো অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে গঠিত। পরিবারে মা-বাবা যদি অন্যান্য সদস্যদের সাথে ভাল ব্যবহার করেন তাহলে শিশুরাও এই ধরনের ব্যবহার শিখবে।                   

পরিবারই শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষায়তন। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ভূমিকা অপরিসীম। তাই আসুন আমরা শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করি এবং পরিবার থেকে শিশু যেন ভাল কিছু শিখতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখি।

Comments

comments

Previous Post Next Post

You Might Also Like

Comments are closed.