খাদ্য ও পুষ্টি, জীবনযাত্রা, ডায়াবেটিস, ফিটনেস, স্বাস্থ্য সমস্যা

ডায়াবেটিক রোগীদের রমজান!

আপনাদের সকল প্রশ্নের সুষ্ঠু সমাধান দেবার জন্য আমাদের এই পোস্ট। কী কী নিয়ম মেনে চলা উচিৎ সে সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বের শেষ নেই ডায়াবেটিক রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন কি না । চলুন ডায়াবেটিস ও রোজা সংক্রান্ত কিছু সাধারণ তথ্য জেনে নেই।

  • টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ আলাদা। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন নিতেই হয়। টাইপ-২ তে কোন কোন ক্ষেত্রে ইনসুলিন নিতে হয় যা রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে।
  • টাইপ-১ ডায়াবেটিসের রোগীরাও রোজা রাখতে পারবেন। তবে রোজা আসার আগেই কিছু অ্যাসেসমেন্ট ও ইনসুলিনের ডোজ সংক্রান্ত বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়া উচিৎ।
  • বেশীরভাগ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগীদের রোজা রাখতে কোন সমস্যা হবার কথা নয়। তবে এদের ক্ষেত্রেও ঔষধ এবং ইন্সুলিনের ডোজ ডাক্তারের পরামর্শে ঠিক করে নিতে হবে।
  • সকল ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই রোজা শুরুর আগে থেকেই তাদের ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো সহ ডায়েট, ঔষধ এবং ইন্সুলিনের ডোজ ঠিক করে নিতে হবে।
  • ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা রাখার জন্য কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলা উচিৎ; যেমন- সময়ানুবর্তীতা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, আত্মার শান্তি এবং সার্বিক শান্তি নিশ্চিত করা। এই চর্চার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
  • রোজা শুরু হওয়ার আগে থেকেই নিয়মিত আপনার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করুন। কমপক্ষে ৪ বার – সেহ্‌রীর আগে ও তিন ঘণ্টা পরে এবং ইফতারের আগে ও তিন ঘণ্টা পর আপনার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করুন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আপনি আপনার ঔষধ ও ইনসুলিন পরিকল্পিতভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন।
  • সেহ্‌রীর সময়ের শেষের দিকে খাবার খান এবং ইফতার শুরু হওয়ার সাথে সাথে খাদ্য গ্রহন করুন। এছাড়া রাতের খাবার কোনভাবেই বাদ দেয়া উচিত হবে না।
  • অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকুন। প্রচুর সতেজ সবজি খান।
  • ব্লাড গ্লুকোজ বা ইনসুলিন ইনজেকশন নিলে আপনার রোজা ভেঙ্গে যায় না।

ডায়াবেটিস রোগীরা রোজার সময় সাধারনত ৪ ধরনের সমস্যায় পরতে পারেন।

  • হাইপার-গ্লাইসেমিয়া (রক্তে চিনির পরিমান বেড়ে যাওয়া) – যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখেন না তাদের এ সমস্যা বেশী দেখা যায়
  • হাইপো-গ্লাইসেমিয়া (রক্তে চিনির পরিমান খুব কমে যাওয়া) – যারা ডায়াবেটিসের ঔষধ বা ইনসুলিন নেন কিন্তু সেহ্‌রী, ইফতার এবং রাতের খাবার ঠিকমত খায় না তাদের এ সমস্যা বেশী দেখা যায়।
  • ডিহাইড্রেশন (পানি শূন্যতা)
  • ডায়াবেটিক কিটোএসিডসিস – এটি একটি  মারাত্মক অবস্থা যা রক্তের চিনি, লবন এবং অন্যান্য উপাদান পরিবর্তিত হয়ে মিশ্র অবস্থার সৃষ্টি করে।

আপনার যদি হাইপোগ্লাইসেমিক লক্ষণ দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে রোজা ভেঙ্গে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই রোগে আক্রান্ত কোন কোন ব্যক্তি ইফতারের আগে শরীরে শর্করার অভাবের কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারেন। এই রোগ আরও মারাত্মক আকার ধারণ করলে ডায়াবেটিক কিটোএসিডসিস হয়ে যেতে পারে।

কিভাবে বুঝবেন আপনার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হচ্ছে?

সাধারণত যারা নিয়মিত ইনসুলিন নিয়ে থাকেন, তারা কোন না কোন সময়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হন। মাথা ধরা, ক্ষুধার ভাব আসা, হঠাৎ ঘাম হওয়া এবং মনোযোগ কমে যাওয়া; এগুলো হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কিছু সাধারণ লক্ষণ। এই সময়ে নিয়মিত ভাবে রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করা উচিৎ। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ছয়ের উপরে থাকলে সেটা নিরাপদ। তিন বা চারে নেমে আসলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে স্বাস্থ্যহানীর আশংকা থাকে। এই সময় রোজা ভেঙ্গে ফেলাই ভাল। সুস্থ হলে আবার রাখা উচিৎ।

খাদ্যাভ্যাস যেমন হওয়া উচিত

আমাদের দেশের মানুষেরা সাধারণত তিন বেলা আহার করে থাকে। যারা ডায়াবেটিসের রোগী, তাদের রোজার মধ্যেও এই তিন বেলা খাওয়ার অভ্যাস চালিয়ে যেতে হবে। ইফতার, সেহ্‌রী এবং রাতের খাবার- খাদ্যাভ্যাসকে এই তিন ভাগে ভাগ করে নিয়মিত ঔষধ গ্রহন করা উচিৎ।

ঔষধ এবং ইন্সুলিনের ডোজ যেমন হওয়া উচিত

রোজার সময় সাধারণ ওষুধ, যেগুলো মেটফরমিন এবং সেনসিটাইজার সেগুলোর তেমন কোনো পরিবর্তন করতে হয় না। যাদের রক্তে চিনির মাত্রা ভালো আছে, এইচবিওয়ান সি ভালো আছে, শুধু মেটফরমিন নিচ্ছে, তাদের রোজার সময় খাদ্য ব্যবস্থাই চলবে, ওষুধটা বন্ধ রাখবে। আর যারা ইনুসুলিন উৎপাদনকারী ট্যাবলেট নেয় তাদের অবস্থা দেখে পরিবর্তন করা হয়। এটা অবশ্য সবার জন্য প্রযোজ্য হবে না। চিকিৎসক রোগীকে দেখে নির্ধারণ করে দেবেন। যারা ২৪ ঘণ্টা মেয়াদি ওষুধ খায় সেগুলোকে শর্ট অ্যাকটিংয়ে নিয়ে আসতে হবে। এগুলোকে রাতের খাবারের সাথে দিতে বলা হয়।

আর যারা দুই বেলা ওষুধ খায় তাদের বলা হয়, রাতের ওষুধটা সকালবেলা নিয়ে যেতে। আর যেই ওষুধটা সকালে খেত সেটা মাগরিবের পরে রাতের খাবারের সময় খেতে হয় এবং রোগী যদি সবল থাকে তখন পুরো ডোজে শুরু করা হয়।

আর রোগী সবল না থাকলে ওষুধটি কম ডোজে শুরু করা হয়। নিশ্চিত হওয়া দরকার যে তার আছরের সময়ের পর রক্তের চিনির মাত্রা কমে গেছে কি না। সাধারণভাবে যেন ৬ এর নিচে না নামে। যদি না নামে তখন সেহরির আগে রক্তে চিনি কেমন আছে সেটা দেখে আরো একটু পরিবর্তন করতে হয়। যাতে তার রক্তচাপ মোটামুটি একটা নিরাপদ অবস্থায় থাকে এবং এইচবিএওয়ানসি  ও যেন পরিবর্তন না হয় ।

যারা ইনসুলিন পায় তাদের ইনসুলিনের ডোজ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করে নিবেন।

উপরে বর্ণিত টিপসগুলো সাধারণ পর্যায়ের ডায়াবেটিসের জন্য প্রযোজ্য। আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।

 

Comments

comments

Previous Post Next Post

You Might Also Like

Leave a Reply