আচরণগত সমস্যা, জীবনযাত্রা, সম্পর্ক, সামাজিক সচেতনতা

বিবাহ বিচ্ছেদ স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয় !

বিয়ে এবং ডিভোর্স; শব্দ দুটি পাশাপাশি শুনে অভ্যস্ত হলেও একটি আরেকটির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। অতিরিক্ত রাগ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া, অবিশ্বাস, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না ভাবা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে স্বামী স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে।

তবে জীবনের যান্ত্রিকতা ও ব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে বিয়ে বিচ্ছেদের সংখ্যা যেন বেড়েই চলেছে। শিক্ষা ও সচেতনতার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে কি আমাদের সম্পর্কের বন্ধনগুলো হালকা হয়ে যাচ্ছে? কখনো ভেবে দেখেছেন, কী এমন ঘটেছিলো আপনাদের মধ্যে যার জন্য এতোদিনের সম্পর্কের ইতি টানতে হলো? বিয়ের আগে কি এসব জটিল বিষয় নিয়ে আপনারা আলোচনা করে নিয়েছিলেন? চলুন, ডিভোর্স সংক্রান্ত জটিলতার কারণ ও সমাধান নিয়ে কথা বলা যাক।

কেন ডিভোর্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন?

১। বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য কোন এক জন নয়, বরং দুই জন-ই দায়ী থাকে। দুই জনের মধ্যে বোঝাপড়া ভাল না হলে স্বামী স্ত্রী এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

২। অহংকার বা ইগোর (Ego) বশবর্তী হয়ে বেশির ভাগ বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে থাকে।

৩। বিয়ে অনেক বড় দায়িত্ব। হঠাৎ করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেবেন না। মাথার উপর দায়িত্বের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লে অনেকেই সামলে উঠতে না পেরে বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়।

৪। সংসারে দুই জন ব্যক্তির পাশাপাশি থাকতে হলে আপোষ করে থাকতে হয়; তবে কখনোই নিজের সত্ত্বা বিকিয়ে দিয়ে আপোষে যাওয়া উচিৎ নয়। এতে আপনার দুর্বলতা ও ব্যক্তিত্বহীনতার প্রকাশ পায়। এভাবে বেশিদিন স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে সংসার করা সম্ভব হয় না।

৫। একে অপরের সাথে কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যেকোনো অভিযোগ নিজের ভিতর চেপে না রেখে বলে ফেলা উচিৎ।

৬। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোন কিছু গোপন রাখা ঠিক নয়।

৭। অনেকে বিয়ে করার সময় টাকাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ভবিষ্যতের আর্থিক সচ্ছলতার কথা ভেবে বিয়ে টা তো করে নেন, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং কিছু দিনের মধ্যেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটতে দেখা যায় ।

৮। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মোহে পড়ে বিয়ে করলে কিছুদিনের মধ্যেই সে মোহ কেটে যায়। সেই সাথে আন্তরিকতাও হারিয়ে যেতে থাকে।

৯। সংসার জীবনে শারীরিক এবং মানসিক উভয় দিকে ভালবাসার প্রয়োজন থাকে। এর মধ্যে যে কোন একটি কম হলে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে।

১০। আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে যা আশা করেছিলেন তা পূরণ না হলে ডিভোর্স দেয়ার আশংকা বেড়ে যায়।

১১। ঝগড়া না মিটিয়ে পুষে রাখলে মনের মধ্যে খারাপ ভাবনাগুলো জমতে জমতে এক দিন ডিভোর্স নামে বিস্ফোরণ ঘটায়।

১২। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্বিমত থাকলে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

১৩। বর্তমানে ভালবেসে বিয়ে করা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু এই ধরনের বিয়েতে বিচ্ছেদ বেশি হয়। বিয়ের আগের জীবনটা এক ধরনের আর পরের টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিয়ের আগে অনেকে আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে বিয়ের পর যার ১০%-ও পূরণ করা সম্ভব হয় না। তখন সমস্যা ঘোলাটে হয়ে ডিভোর্সে রূপ নেয়।

১৪। ভালবাসা স্বর্গীয় হলেও সেটা টিকিয়ে রাখার জন্য আপনাকে স্বপ্নের জগৎ থেকে বেরিয়ে বাস্তবে এসে ভালবাসতে হবে। নইলে বিয়ের পরে বাস্তব যখন কড়া নাড়ে তখন পরিণতি হয় বিবাহ বিচ্ছেদ ।

১৫। অনেকেই বিয়ের আগেই যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। অনেকের ক্ষেত্রে এই চাহিদা কয়েক দিন পরেই হারিয়ে যায়। বিয়ের পর সংসার নিয়ে তারা সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তখনই হয় ডিভোর্স।

ডিভোর্স থেকে সরে আসুন!

১। বিয়ে করার আগে বিভিন্ন দিকের কথা চিন্তা করুন। আবেগের বশবর্তী হয়ে বা শারীরিক চাহিদার তাড়নায় বিয়ে করে ফেলবেন না। বিয়ের আগে বিয়ের পরবর্তী দায়িত্বগুলো সম্পর্কে সচেতন হন।

২। কাউকে ভালবেসে থাকলে তাকে বিয়ে করার আগে অন্তত একটি বছর অপেক্ষা করে দেখা উচিৎ। বিয়ে করার আগে অবশ্যই দুই জন মিলে ভবিষ্যতের ব্যাপার গুলো বিস্তারিত আলোচনা করে নেবেন।

৩। যাকে বিয়ে করছেন তার সম্পর্কে ভালভাবে জানার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে কিছুটা সময় নিন।

৪। আপনার সঙ্গীকে সঠিক ভাবে বোঝার চেষ্টা করুন।

৫। কোন সিদ্ধান্ত একা নিবেন না। অন্তত আপনার সঙ্গীকে আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অবগত রাখবেন।

৬। মিথ্যার উপর কোন সম্পর্ক বেশিদিন টিকতে পারেনা। মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেবেন না।

৭। কথা বলুন, গল্প করুন। দুজনে মিলে মজার কিছু করুন। একে অপরের সাথে সবকিছু শেয়ার করুন।

৮। কোন কাজের জন্য জোর করবেন না। কাজটি প্রয়োজনীয় হলে দুজনে মিলে সমঝতায় আসুন।

৯। আপোষ করবেন কিন্তু নিজের সত্ত্বা বিকিয়ে দিয়ে নয়। সংসারে কেউ আপনার নিচে বা উপরে নয়। আপনার সঙ্গীকে অবশ্যই সম্মান করুন।

১০। ঝগড়া হওয়া স্বাভাবিক, তবে সেটা মিটিয়ে নেওয়ার মনোভাব থাকতে হবে। অহংকার বা ইগো ধরে রাখলে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়।

১১। আপনার সঙ্গীর ভাল কাজের সুনাম করুন এবং খারাপ কাজগুলো করতে নিষেধ করুন।

১২। সৎ থাকুন। সংসারের প্রত্যেকটি কাজে একে অপরকে সাহায্য করুন।

১৩। কারো সাথে মনের মিল না হলে বিয়ে করা উচিৎ নয়। এরকম বিয়ে সাধারণত সুখকর হয় না এবং পরিণাম হয় বিবাহ বিচ্ছেদ ।

১৪। একে অপরের কাছ থেকে এমন কিছু পাওয়ার আশা রাখবেন না যা ক্ষমতার বাইরে। আপনার সঙ্গীর কোন কাজে কষ্ট পেলে চুপ করে মনে রাখার চেয়ে বলে ফেলুন এবং ভুলে যান। এতে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটার সম্ভবনা কমে আসে।

১৫। কোন ব্যাপারে সমাধানে না আসতে পারলে কিছুটা সময় দিন। সময় সব কিছুর সমাধান দিয়ে দেয়।

১৬। আপনাদের দাম্পত্য জীবনের একান্ত কথা তৃতীয় কোন পক্ষ যেন না জানে। আপনার সংসার আপনাদের দুই জনের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন। এখানে তৃতীয় পক্ষ কখনোই কাম্য নয়। তৃতীয় কাউকে জানানো মানে নিজের সঙ্গীকে অপমানিত করা। এক্ষেত্রে আপনার সঙ্গীর সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনে অন্য কারো  পরামর্শ নিতে পারেন।

১৭। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর যৌন সম্পর্ক সংসার টিকিয়ে রাখার অনিবার্য একটি উপকরণ। যৌন সম্পর্কে অবহেলা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে থাকে।

Comments

comments

পূর্ববর্তী পোস্ট পরবর্তী পোস্ট

আপনি হয়ত এগুলো পছন্দ করতে পারেন