আচরণগত সমস্যা, গবেষণা, জীবনযাত্রা, বিষেশজ্ঞ মতামত, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সচেতনতা

প্রান খুলে হাসার উপকারিতা

আজকাল কটা মানুষ মন খুলে হাসে  ভাবুন তো ? আধুনিক জীবনে কর্পোরেট কালচারে আমরা যেন রোবট হয়ে গেছি। সবাই মেপে মেপে কথা বলেন এবং হাসেনও মেপ মেপে। কারণ  মন খুলে যারা হাসে  তাঁদের নাকি কোন ব্যক্তিত্ব নেই। তাই হাসির খোরাক হতে আপনারাও চান না। ফলে লোকের সঙ্গে দেখা হলে ঠোঁটে মিথ্যা হাসি ফুটিয়ে সৌজন্য বিনিময়ই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসি শুধু মজা করার জন্য নয়।

হাসি আমাদের অনেক দিক দিয়ে সুস্থ রাখতে পারে। পারে অসুস্থকে ভালো করে তুলতে এ কথা বৈজ্ঞানিক সত্য। হাসি সুখ, আনন্দ ও সুস্থতার প্রতীক। হাঁচি কিংবা কাশির শব্দ শুনলে যেমন আমরা বুঝতে পারি অসুস্থতা । তেমনি হাস্যরসের আওয়াজ শুনলে আমরা বুঝি বিরাজ করছে সুখ, আনন্দ ও সুস্থতা। হাসি প্রাকৃতিক, হাসি স্বাভাবিক। হাসি শক্তিদায়ক,হাসি আমাদের রোগ প্রতিরোধক শক্তিকে উজ্জীবিত করে, হাসি ব্যাথা লাঘব করে এবং মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়।

আপনি না হাসলে আপনার শরীর নীচের এই সুফলগুলি পাবে না।দেখুন সেই সুফল গুলো কি –

১.  হাসি হৃদরোগ কমাতে সাহায্য করে:
প্রাণ খুলে হাসি আমাদের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এরফলে যারা যে কোনও কারণেই মন খুলে হাসতে পারেন, তাঁদের হৃদরোগের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। এছাড়াও রক্তচাপ কমাতে হাসির জুড়ি মেলা ভার। মজার ব্যাপার হচ্ছে  ১০০ বার হাসি ১০ মিনিট নৌকা চালানো কিংবা ১৫ মিনিট সাইকেল চালানোর সমান শারীরিক কসরত। রক্তচাপ কমে যায় বটে কিন্তু শারীরিক সঞ্চালনের কারণে সবখানে রক্ত চলাচল যায় বেড়ে। রক্তে সংযুক্ত হয় বেশি পরিমাণ অক্সিজেন। হাসিতে ডায়াফ্রাম, পেটের ও রেসপিরেটরি মাংসপেশিসমূহ এবং মুখ, এমনকি পা কিংবা পিঠের মাংসপেশির চমৎকার এক্সারসাইজ হয়। এজন্য উচ্চ হাসির পর আমরা খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়ি এবং হাঁপাতে থাকি। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন ও গভীর হয়ে পড়ে। শরীরের অভ্যন্তরেও ঘটে অনেক শারীরবৃত্তিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন। সব মিলিয়ে এ যেন খানিকটা ‘অ্যারোবিক’ শরীরচর্চা। তাই বলা হয় হাসি থেকে ওজন কমার মতো উপকারও পেতে পারি। এ ছাড়া হাসি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমায়। আমাদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় বিরাট ভাবে।

 ২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিঃ

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন ইন বাল্টিমোর-এর গবেষকরা রোগ নিরাময়ে হাসির প্রয়োগ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তারা প্রমাণ পেয়েছেন, রোগ নিরাময়ে হাসি উপকারী। তারা বলেছেন, অবদমিত ক্রোধ, ঘৃণা আমাদের ইম্যিউন সিস্টেমকে নিস্তেজ করে দেয়। অপরপক্ষে হাসি, আনন্দ ইম্যিউন সিস্টেমকে উজ্জীবিত করে। ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা দেখিয়েছেন  হাসি আমাদের ইম্যিউন সিস্টেমকে উত্তেজিত করে শ্বেতকণিকা ‘টি’ সেল তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে  ফলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি দৃঢ় হয়, নানা জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে আমরা বিজয়ী হতে পারি। আমরা যখন হাসি তখন আমাদের রক্তচাপ কমে যায়। বৃদ্ধি পায় ন্যাচারাল কিলার সেল।যারা হিউমার ধ্বংস করে ও ভাইরাসকে মেরে ফেলতে সক্ষম। বৃদ্ধি পায় গামা ইন্টারফেরন, টি সেল ও বি সেল, ফলে বেশি বেশি তৈরি হয় অ্যান্টিবডি। হাসি শ্বাসতন্ত্রকে পরিষ্কার করে দেয় শ্বাসনালীতে লেগে থাকা মিউকাস ছুটিয়ে দিয়ে। এ সময় বেড়ে যায় থুথুতে নিঃসৃত স্যালিভারি ইম্যিউনোগ, ফলে তা শ্বাসতন্ত্রে জীবাণু সংক্রমণ প্রতিহত করে।

৩. দুশ্চিন্তা কমে:
কাজের চাপ, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চাপ,এই সবকিছু নিয়েই আমরা দুশ্চিন্তায় জর্জরিত। তবে দুশ্চিন্তাকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে ফেলবেন না। উল্টে হাসুন। মনে রাখবেন, খারাপ সময় একদিন ঠিক আপনাকে বিদায় জানাবে। সেই কারণে নিজের আনন্দ, হাসি এগুলোকে বিসর্জন দিতে যাবেন না। এছাড়াও হাসলে এন্ডরফিন নামক হরমনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা আমাদের মস্তিষ্ককে চিন্তামুক্ত রাখতে সাহায্য করে। কঠিন বিরূপ পরিস্থিতিতে অবলীলায় হাসতে পারা এক বিরল যোগ্যতা। আপনি যখন হাসতে থাকেন, তখন কোন বিষণ্নতা, ক্রোধ, দুশ্চিন্তা বা দুঃখবোধ আপনাকে গ্রাস করতে পারে না। হাসি আপনার মনকে ভালো করে দেয় এবং এই ভালো লাগা রয়ে যায় হাস্য-কৌতুকের পরিবেশ থেকে চলে আসার পরও অনেকক্ষণ।

৪. মেজাজ চনমনে রাখে:
এন্ডরফিন নামক হরমনের নিঃসরণ আমাদের মুড ভাল রাখতে সাহায্য করে। তাই তো যখনই মানসিক দিক থেকে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়বেন অথবা কোনও কারণে ভীষণ মন খারাপের মধ্যে ডুবে থাকবেন, তখন চেষ্টা করুন মন খুলে হাসার। এমনটা করলে দেখবেন উপকার মিলবে।হাসির কারনে প্রচুর অক্সিজেন শরীরের ফুসফুসে যায় ফলে টা রক্তের মাধ্যমে ব্রেনে যায়। তাই ব্রেনও দ্রুত ঠাণ্ডা হয়। ব্যাপার গুলো এত দ্রুত ঘটে যে আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা ।

 ৫. কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে:
অফিসের কম্পিউটারে ফেসবুক, ইউটিউব সব ব্লক করা । অফিসের যুক্তি  এতে  নাকি আপনি একাগ্রচিত্তে কাজ করতে পারেন না। কিন্তু এই পদ্ধতি একেবারেই ভুল। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন-কাজের ফাঁকে সময় করে মজার ভিডিও, ছবি এগুলো দেখুন। এতে আপনার একঘেয়েমি কাটবে এবং আপনি কাজের প্রতি পুনরায় মনোযোগ দিতে পারবেন দৃঢ় চিত্তে ।

৬. বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে সাহায্য করে:
আপনি তখনই কারোর কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারবেন, যখন আপনি মন খুলে হাসবেন। আর তাই যখনই কারও সঙ্গে কথা বলবেন, চেষ্টা করুন হেসে কথা বলার। এতে আপনার প্রতি অন্যদের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন বাড়বে, তেমনই বহু ভুল বোঝাবুঝি এক নিমেষে হাওয়া হয়ে যাবে একটা মুচকি হাসিতেই।

৭. সহমর্মিতা বাড়িয়ে তোলে:
আমরা যখন কারও সঙ্গে খারাপভাবে বা রাগ করে কথা বলি  তখন আমরা এটা বুঝতে পারি না যে এর ফলে সেই মানুষটি কতটা কষ্ট পান। তবে যে কোনও বিষয়কে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে সেই ভাবে কথা বললে দুই তরফেই সমস্যা অনেকটাই কমে। এছাড়াও অনেক সময় আমাদের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জাগ্রত হয়। নিজের এই ধরণের ভাবনায় নিজেই হাসুন। দেখবেন, রাগ গলে পানি হয়ে যাবে । উল্টে অন্য মানুষের সমস্যা বুঝতে আপনি বেশ তৎপর হয়ে উঠবেন।

৮. যন্ত্রণা কমাতে সাহায্য করে:
কত কারণেই না আমরা ব্যাথা পেয়ে থাকি। তা সে মানসিক হোক বা শারীরিক। আর ঠিক এই কারণেই  ব্যাথা কমাতে মন খুলে হাসুন। আর আগেই বলা হয়েছে যে হাসলে এন্ডরফিন হরমোন নিঃসরণ হয়। এরফলে আমাদের যে কোনও ব্যাথাই কমে যায়। হাসির জানালা দিয়ে উবে যায় যে কোন চাপা ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ কিংবা গ্লানিবোধ, যা হয়তো বড় কোন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারতো। তাই বলা হয়, হাসি শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক ওষুধ। বিনা খরচে হাসি রোগমুক্তি দেয়। এর জন্য আমাদের কোন জিমে যাওয়ার দরকার নেই। দরকার নেই কোন প্রশিক্ষণের। হাসি আমাদের জন্মগত প্রবৃত্তি। নবজাতক শিশু জন্মের প্রথম সপ্তাহেই হাসতে শুরু করে এবং প্রথম মাসেই সশব্দে হাসতে পারে। বড় হতে হতে গাম্ভীর্য এসে ভর করে আমাদের ওপর। তাই হাসি শিখতে হলে, প্রাণ খুলে হাসতে হলে তাকাতে হবে শিশুদের দিকে। তাদের দুনিয়া আনন্দময়। তুচ্ছ কারণে তারা হাসতে পারে। হাসার জন্য তাদের কোন লজিক লাগে না।

৯. মনযোগী হতে সাহায্য করে:
দুশ্চিন্তা বা একঘেয়েমি আমাদের যে কোনও কাজের ওপরেই বিরক্তির সূচনা করে। আপনিও যদি এরকম সমস্যার মধ্যে থাকেন, তাহলে মন খুলে হাসুন। আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠুন। আর তা যদি না হয় তাহলে অন্তত হাসির কোনও সিনেমা দেখুন। দেখবেন মন একদম ভালো হয়ে গেছে।

তাই আসুন আমরা বেশি বেশি হাসি ।  জীবনকে আনন্দময় করে তুলি এবং সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করি।

 

 

Comments

comments

পূর্ববর্তী পোস্ট পরবর্তী পোস্ট

আপনি হয়ত এগুলো পছন্দ করতে পারেন