“জীবনের পথ চলায়”-ডাঃ মোঃ আশরাফ হোসেন
কর্মজীবন, জীবন কথা, ডাক্তার

“জীবনের পথ চলায়”-ডাঃ মোঃ আশরাফ হোসেন

বাংলাদেশে বিশিষ্ট স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ডাঃ মোঃ আশরাফ হোসেন অন্যতম। ঢাকার ডেন্টাল কলেজের দীর্ঘকালীন অধ্যক্ষ, প্রকল্প পরিচালক, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদের ডীন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন জাতীয় কমিটির সদস্য হিসাবে ডেন্টাল পেশার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৯ শে জানুয়ারী। পিতা মরহুম মোঃ আলী হোসাইন এবং মাতা মরহুম আশরাফুন্নেসা। তিনি ১৯৬১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষ এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। এ সময় তিনি দেশের ডেন্টাল চিকিৎসার দৈন্যদশা বিবেচনা করে এমবিবিএস কোর্স পরিবর্তন করে ডেন্টাল চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে প্রথম ব্যাচ বিডিএস কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে তিনি বিডিএস ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে ডেন্টাল বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসাবে তাঁর কর্মময় জীবনের যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা ডেন্টাল কলেজে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে একজন প্রগতিশীল শিক্ষক হিসাবে মর্যাদা লাভ করেন। দেশের জনগণকে ডেন্টাল স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে ‘শরীরটাকে সুস্থ রাখুন’ ও ‘আপনার ডাক্তার’ ইত্যাদি টেলিভিশন প্রোগ্রামে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন।

‘ডি মোন্টমোরেন্সি কলেজ অফ ডেন্টিস্ট্রিতে’ এমডিএস কোর্সে অধ্যয়নের জন্য ১৯৬৯ সালে পাকিস্থানের লাহোরে পাড়ি জমান। কিন্তু এই কোর্সের শেষ পর্যায়ে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি এমডিএস কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি।

১৯৭২ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা ডেন্টাল কলেজে যোগদান করেন। এ সময় ডেন্টাল চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা অর্থোডন্টিকস চিকিৎসা বা উঁচুনিচু দাঁত এবং অসামঞ্জস্য চোয়ালের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রচলন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন। এ সময় তিনি ডেন্টাল কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন কমনওয়েলথ মেডিকেল স্কলারশিপ লাভ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখানে অবস্থানকালে ‘রয়েল কলেজ অফ সারজনস, লন্ডন’ থেকে স্বল্প সময়ে প্রাইমারি ডিপ্লোমা ইন অর্থোডন্টিকস বিষয়ে পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হন। ১৯৭৯ সালে  ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিসটল ডেন্টাল স্কুল’ থেকে কনজারভেটিভ ডেনটিসট্রি বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আসার পরে তিনি ঢাকা ডেন্টাল কলেজে কনজারভেটিভ ডেনটিসট্রি বিভাগে বিভাগীয় প্রধান হিসাবে যোগদান করেন। এ সময় তিনি তাঁর সহকর্মীদের সাথে নিয়ে ‘রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট’ বিষয়ে বিভাগে কার্যকর উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দেশে প্রথম বেসরকারী ডেন্টাল কলেজ পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ এর প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক এবং গভর্ণিং বডির প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘসময়  ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি ১৯৯৫ সালে বর্তমান বিএসএম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেন্টাল বিভাগের চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে তিনি ফ্যাকাল্টির ডীন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ডেন্টালের বিভিন্ন বিষয়ে এমএস এবং এফসিপিএস কোর্স চালু করার বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

তিনি চিকিৎসা ক্ষেত্রে কুসংস্কার ও অপচিকিৎসা দূর করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালার ব্যবস্থা করেন। অসংখ্য মেডিকেল ও ডেন্টাল ক্যাম্প করে বিনামূল্যে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্মাননা লাভ করেন।

বিএসএম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সদস্য থাকা অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ করে ডেন্টাল ফ্যাকাল্টির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলে ট্রেজারার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সামরিক হাসপাতালে তিনি অনারারি লেঃ কর্ণেল পদমর্যাদার দায়িত্ব পালন করেন এবং আর্মি ডেন্টাল চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহন এবং পরামর্শ প্রদান করেন।

তিনি বাংলাদেশ কলেজ অফ ফিজিশিয়ানস এন্ড সার্জনস এর সার্জারি ফ্যাকাল্টি এবং ফ্যামিলি মেডিসিন ফ্যাকাল্টির সদস্য ছিলেন। এখানে তিনি ডেন্টাল পোস্ট গ্রাজুয়েট এফসিপিএস শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও বিএসএম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক বিভাগ এবং বিভিন্ন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলে ডেন্টাল সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটি থেকে একজন সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার সাফল্য ডেন্টাল পেশার অগ্রগতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কোয়াক ডেন্টাল চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন প্রথা বাতিল করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞান, সমাজসেবা এবং ডেন্টাল শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য সাফল্যের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ যাবৎ তাঁকে ৩২ টি সম্মাননা প্রদান করেন। তাছাড়াও তিনি শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর স্বর্ণপদক লাভ করেন।

ডাঃ মোঃ আশরাফ হোসেনের মতে, বাংলাদেশে ডেন্টাল চিকিৎসা ব্যবস্থাকে কার্যকর এবং পূর্নাঙ্গ রূপ দিতে হলে ডেন্টাল সার্জনদের পাশাপাশি ডেন্টাল অক্সিলিয়ারি জনবল তৈরি করতে হবে।

Comments

comments

Previous Post Next Post

You Might Also Like

Comments are closed.