চকলেট খাবেন কি?
খাদ্য ও পুষ্টি, গবেষণা, হেলথ টিপস্‌

চকলেট খাবেন কি?

এমন কাউকে পাওয়া যাবে না যিনি তার জীবনে একবারও চকলেট খাননি।   ছোট বড় সবার কাছেই চকলেট খুব আকর্ষণীয়। চকলেট পৃথিবীর জনপ্রিয় খাবার গুলোর একটি। আমাদের দেশেও চকলেটের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বাচ্চাদের মাঝে চকলেটের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্তি লক্ষ্য করা যায়। নানা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে চকলেটের উপাদান মানুষের কর্মদক্ষতার উপর ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। চকলেটে বিশেষ করে পাঁচটি উপাদান থাকে। কোকো পাউডার, কোকো লিকার, কোকো বাটার, চিনি ও দুধ। চকলেট তৈরির মূল উপকরণ হলো কোকোয়া গাছের বীজ। এই বীজ শুকিয়ে নিয়ে গাজানোর পর তা গুঁড়ো করা হয়। এই গুঁড়ো থেকেই তৈরি হয় চকলেট। আসলে চকলেট তৈরিতে কোকোয়া ব্যবহার করা হয় দুভাবে। এর গুঁড়ো অথবা কোকোয়ার মাখন।   সাধারণ মিষ্টি চকলেট বা মিল্ক চকলেটে ব্যবহার করা হয় কোকোয়ার মাখন, চিনি, দুধ ও অন্যান্য উপকরণ। এতে কোকোয়ার গুঁড়ো মেশানো হয় না। ডার্ক চকলেট তৈরিতে ব্যবহার করা হয় কোকোয়ার গুঁড়ো।

মূলত চকলেটের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য এর মধ্যে মিষ্টি মেশানো হয়। যা পরিমাণে বেশি থাকলে শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই ডার্ক চকলেট খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী। রাতে খাওয়ার পর ১৫ গ্রাম চকলেট খাওয়া যেতে পারে, যাতে ৬৬ শতাংশ ডার্ক চকলেট বা কোকোয়া রয়েছে এবং চিনি, চর্বি ও দুধের পরিমাণ ৩৪ শতাংশ। যেসব চকলেটের ৭০ শতাংশ কোকোয়া দিয়ে তৈরি, সেগুলোকেই বলা হয় ডার্ক চকলেট। মূলত তৈরির প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে কোন চকলেটে কী পরিমাণ কোকোয়া থাকবে। চকলেটে কোকোয়া যত বেশি থাকবে, সেটি স্বাস্থ্যের জন্যও বেশি উপকারী হবে।

ভালোমানের চকলেট হাতের উষ্ণতাতেই গলে যাবে, একে সবসময় ঠাণ্ডায় রাখতে হয়। তবে নিম্নমানের চকলেট তিন দিন ধরে ফ্রিজের বাইরে রাখলেও গলে না, শক্ত থাকে।

চকলেট নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে চকলেটের কিছু উপকারীতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

চকলেট ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: পরিমিত পরিমাণে চকলেট খেলে তা স্বাস্থ্যে বা ওজনে তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। যে কোনো খাবার অতিরিক্ত পরিমানে খাওয়া হলে ওজন বৃদ্ধি পাবে। তাই কম চর্বিযুক্ত চকলেট পরিমাণ মতো খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

ব্যায়ামের আগে পরে চকলেট: শরীরে শক্তি সরবরাহের জন্য বেশ কার্যকর একটি খাবার চকলেট। মিল্ক চকলেটের তুলনায় ডার্ক চকলেটের উপকারীতা বরাবরই বেশি। তাই ব্যায়ামের আগে ও পরে চকলেট খেলে শরীরের ক্লান্তিভাব দূর হবে দ্রুত। তবে এক্ষেত্রেও কী পরিমাণে চকলেট খাওয়া হবে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 ব্রণ দাঁতের ক্ষয়ের জন্য কি চকলেট দায়ী!: শিশুদের চকলেট খাওয়া কমাতে মায়েরা দাঁতে পোকা হওয়ার ভয় দেখাতেন। দাঁতে পোকা অর্থাৎ দাঁত ক্ষয়। আর এটি বেশ প্রচলিত একটি ধারণাও বটে। তবে এ ধারণার তেমন যুক্তি সঙ্গত ভীতি নেই।

দাঁত ক্ষয়ের পাশাপাশি ব্রণ হওয়ার ভয়েও অনেকে চকলেট এড়িয়ে চলেন। অ্যালার্জি পরীক্ষা না করে ব্রণ বা এ ধরনের সমস্যার জন্য চকলেটকে দোষী করা যাবে না।

 ত্বক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী চকলেট: কোকোয়া বিনে রয়েছে মেগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফ্লাভানয়েডসের মতো বেশ কিছু উপকারী পুষ্টি উপাদান। এই উপাদানগুলো শরীর ও ত্বকের জন্য বেশ উপকারী।

 মানসিক পরিস্থিতি ঠিক রাখতে চকলেট: মন খারাপ হলে চকলেট খেলে মন ভালো হয়, এটি বেশ জনপ্রিয় একটি ধারণা। গ্রিন টি’র মতোই উপকারী চকলেট। মন ভালো করতে চকলেটের কিছু উপাদান বেশ ভালো। তবে এক্ষেত্রেও ডার্ক চকলেট বেশি কার্যকর।

হোয়াইট চকলেট কি আসলেও চকলেট!: সাদা রংয়ের চকলেটই হোয়াইট চকলেট নামে পরিচিত। তবে সাধারণ চকলেটে কোকেয়ার পরিমাণ বেশি থাকায় রং বাদামি হয়ে থাকে। আর হোয়াইট চকলেটে থাকে কোকয়া বাটার, দুধ এবং চিনি।

২০০২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চকলেটে থাকা ক্যাটেকিনস নামের একটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পদার্থ ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। আর ডার্ক চকলেট ডায়াবেটিসকে দূরে রাখে। কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর ২০০৫ সালে চালানো এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে চকলেটে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এ ছাড়া হৃদ্‌যন্ত্র ও ত্বকের জন্যও উপকারী চকলেট।

কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় চকলেটের সঠিক উপাদানের পরিবর্তে চকলেট তৈরীতে ক্ষতিকর কেমিকেল ব্যবহার করছে। যেমনঃ চিনির পরিবর্তে স্যাকারিন, দুধের পরিবর্তে কেমিকেল পাওডার ইত্যাদি। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত চকলেটে থাকে ভেজাল কেমিকেল, দুধ ও চিনি। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। এগুলো খুব একটা পুষ্টিকরও নয়। অতিমাত্রায় এই সমস্ত কেমিকেল যুক্ত চকলেট খাওয়ার কারণে শিশুদের শরীরের উপর নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

  • কেমিকেল যুক্ত চকলেট শিশুদের রক্তনালীতে চর্বি সৃষ্টি করে। ফলে স্ট্রোক হতে পারে।
  • কাঁচা চকলেটে কোকো মাখন নামক চর্বি অনেক বেশি থাকে। চকলেট উৎপাদনকারীরা চকলেটের সাথে অন্যান্য উপাদান যেমন চর্বি, চিনি ও দুধ যোগ করে। আর এইসব উপাদান দেহকে মোটা করে দেবার জন্যে দায়ী।
  • চকলেট এবং কোকো সাধারণত সীমিত থেকে অধিক পরিমাণে অক্সালেট ধারণ করে থাকে। এই অক্সালেটের জন্য কিডনিতে পাথর হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • বয়স্ক ব্যক্তিদের উপর চকলেটের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করে দেখা গেছে যে, চকলেট বয়স্ক ব্যক্তিদের অস্টিওপরোসিস নামক হাড়ের ক্ষয় রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
  • কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চকলেটের জন্যে বাচ্চাদের এলার্জির সমস্যা হতে পারে।
  • বেশকিছু প্রমান পাওয়া গেছে যে চকলেট শিশুদের জন্যে নিয়মিত খাওয়াটা নেশার মতো একটি আসক্তি সৃষ্টি করে।
  • তাছাড়াও ভালো মতো ঘুম হয় না, এমন শিশুদের জন্যে চকলেট খাওয়াটা ক্ষতিকর।
  • পেটে হজমের সমস্যা আছে, সেসকল শিশুদের জন্য চকলেট খাওয়া ক্ষতিকর।
  • দেহের কোনো স্থানে কেটে গেলে যাদের সহজে রক্ত জমাট বাঁধে না, তাদের ক্ষেত্রে চকলেট খাওয়া ক্ষতিকর। কারণ, চকলেটের কিছু উপাদান দেহের ক্ষতস্থানের রক্ত জমাট বাঁধতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

বাচ্চারা যা দেখে তাই শেখে। তাদের অভ্যাস পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে অবশ্যই সে ভালো কিছু শিখবে। কেমিকেল যুক্ত চকলেট শরীরের জন্য ক্ষতিকর, সেই ক্ষতিকর খাবার মহা সমারোহে বাচ্চাদের হাতে তুলে দেয়ার মাঝে আনন্দ পাওয়াটা ঠিক না। স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর খাবার না খেয়ে বাচ্চারা এসমস্ত ক্ষতিকর খাবার খাচ্ছে এটা কাম্য নয়। চেষ্টা করলে অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব। চেষ্টাটা স্বদিচ্ছার সাথে করেই দেখুন না!

Comments

comments

পূর্ববর্তী পোস্ট পরবর্তী পোস্ট

আপনি হয়ত এগুলো পছন্দ করতে পারেন