সামাজিক সচেতনতা, স্বাস্থ্য সমস্যা

আলঝেইমার একটি বিশেষ রোগ

 (Dementia) হল এক ধরনের মস্তিষ্কের ব্যাধি যা স্মৃতিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। অ্যালঝেইমার ডিজিজ হলো ডিমেনশিয়ার একটি সাধারন রূপ ।  এই সমস্যা তীব্র অবস্থায় চলে গেলে এটি রোগীকে তার দৈনন্দিন কাজ করতে, বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজনকে চিনতে এবং কোনো কথা বুঝতে বাধা দেয়। এটি একটি মারাত্নক রোগ যা সময়ের সাথে সাথে আরও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।

এই রোগের চিকিৎসা খুবই সীমিত । তবে প্রাথমিক অবস্থায় ঔষধের সাহায্যে এর চিকিৎসা করা হলে তা অত্যন্ত কার্যকর হয়। যদি প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ শণাক্ত করা যায়, তবে রোগীর পরিবার সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারবে এটি বয়স্কদের বেশি হয়ে থাকে। পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের অ্যালঝেইমার রোগ, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপ এবং কোনো ধরনের মানসিক আঘাত পাওয়ার ঘটনা থাকলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

কারণ

বিজ্ঞানীদের মতে বংশ ও জীনগত কারণ, জীবন-যাপনের ধরন এবং পরিবেশগত কারনে এই রোগটি হতে পারে।জিনগত কারণে প্রায় ৫ শতাংশেরও কম লোকের এই রোগটি হয়ে থাকে। তবে জিনগত অবস্থা এই রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করে।যদিও এই রোগের সঠিক কারণ এখনও জানা যায় নি, তবে এই রোগ যে মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলে তা নিশ্চিত। এই রোগ ব্রেইন বা মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি সাধন করে এবং তা নষ্ট করে ফেলে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় খুব কম স্নায়ু কোষ থাকে যা সুস্থ কোষের সাথে যুক্ত থাকে।যত বেশি কোষ নষ্ট হয় ব্রেইন ততোই সংকুচিত হয়ে পরে । যখন চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কোষ পরীক্ষা করে তখন দুই ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে থাকেন।

প্লাক (Plaques): প্রোটিন সমৃদ্ধ এই প্লাকগুলোকে বেটা-এমাইলোয়েড বলে যা মস্তিষ্কের কোষগুলোর ক্ষতি করে এবং তাদের নষ্ট করে ফেলে ও কোষের সাথে কোষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যদিও এই রোগের জন্য কেন মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যায় তা জানা যায় নি, তবে মস্তিষ্কের কোষের বাহিরে অবস্থিত বেটা-এমাইলয়েডের জন্য এটা হতে পারে।

ট্যাঙ্গেল বা মস্তিষ্কের কোষের বিকৃতি বা কুঁচকে যাওয়া (Tangles): মস্তিষ্কের কোষে পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় উপাদান একটি অভ্যন্তরীণ পরিবহন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। এই প্রক্রিয়ার জন্য এক ধরনের প্রোটিনের প্রয়োজন যা টাউ নামে পরিচিত। অ্যালজাইমার রোগ হলে টাউ মস্তিষ্কের কোষের অভ্যন্তরে পেঁচিয়ে যায় এবং পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে। যার ফলে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যায়।

লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন:

  1. স্মৃতিশক্তির সমস্যা
  2. বিষণ্নতাজনিত সমস্যা
  3. বিষণ্নতা
  4. নড়াচড়া করতে সমস্যা হওয়া
  5. আক্রমণাত্মক আচরণ
  6. ডিলিওশন অথবা হ্যালুসিনেশন
  7. কথা বলতে কষ্ট হওয়া
  8. অস্থিরতা
  9. মাথার অস্বাভাবিক ত্বক
  10. ভয় এবং আতংক
  11. মাংসেপশীর টান বা খিঁচুনি
  12. চোখ জ্বালাপোড়া করা

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুধুমাত্র বার্ধক্যের জন্য এই রোগ হয় না, তবে ৬৫ বছরের পর এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যাদের বয়স ৮৫ এর উর্ধ্বে তাদের অর্ধেকেরও বেশি ব্যক্তির এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।যাদের জিনগত কারণে এই রোগ হয় তাদের ক্ষেত্রে ৩০ বছরের পর পরই এই রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

বংশ ও জিনগত কারণ (Family history and genetics): যদি পরিবারের ঘনিষ্ঠ কারো যেমন মা-বাবা, ভাই-বোনের এই রোগ থাকে তবে তার এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, তিনটি জিনের পরিবর্তনের জন্য এই রোগটি হয়ে থাকে। কিন্তু এটি খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায়। মহিলারা পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে ফলে তাদের এই রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

মানসিক দক্ষতা হ্রাস পাওয়া (Mild cognitive impairment): যাদের আগে থেকেই মানসিক দক্ষতা বা ক্ষমতা কম থাকে তাদের পরবর্তীতে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু তারা যে এই রোগে আক্রান্ত হবেই তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না।

মস্তিষ্কের আঘাত (Past head trauma): যারা পূর্বে কোনো ধরনের মানসিক আঘাত বা মাথায় আঘাত পেয়েছেন তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

অভ্যাসগত বিষয় এবং হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য (Lifestyle and heart health): এই রোগটি অভ্যাসগত বিষয়ের উপর নির্ভর করে এমন কোন তথ্য বিজ্ঞানীদের জানা নেই।

তবে স্বাস্থ্যগত কিছু বিষয় এই রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে যেমনঃ

  • নিয়মিত ব্যায়াম না করা।
  • ধূমপান।
  • উচ্চ রক্তচাপ।
  • রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি।
  • হোমোসিস্টিনের মাত্রা বৃদ্ধি (হোমোসিস্টিন=এক ধরনের অ্যামিনো এসিড)।
  • অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস।
  • ফলমূল ও শাক-সবজি কম খাওয়া।

 

 

 

Comments

comments

Previous Post Next Post

You Might Also Like

Comments are closed.